সিলেটের বিশ্বনাথে গৃহবধূ স্বপ্নার রহস্যজনক মৃত্যু!


এসবাংলাপ্রো ডেস্ক: সিলেটের বিশ্বনাথে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু  হয় শরিফা জান্নাত স্বপ্না (১৮) নামে এক গৃহবধুর। মাত্র বিয়ের তিন মাসের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। 

গত শনিবার (২ মে) বিশ্বনাথের তালেবপুর গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে স্বপ্নার লাশ উদ্ধার করা হয়।  এ ঘটনার পর গৃহবধূ স্বপ্নার স্বামী সুমিন আহমদ আত্মহত্যা করেছেন বলে জানান।

তবে স্বপ্নার বাবার বাড়ির মানুষজনের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য স্বপ্নাকে নির্যাতন করা হতো। তাকে হত্যা করে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়েছে।

এই মামলা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে নিহতের ভাই বাবুল মিয়ার। স্বপ্নার মৃত্যুর দিনই বিশ্বনাথ থানায় একটি ‘অপমৃত্যু’ মামলা হয়েছে। মূল ঘটনা ধামাচাপা দিতে স্বামীর সঙ্গে পুলিশেরও যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

অপমৃত্যুর মামলার নথিতে দেখা গেছে, স্বপ্নার ভাই বাবুল বিশ্বনাথ থানায় উপস্থিত হয়ে বোন আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এতে স্বপ্নার ভাইয়ের দাবি, পুলিশের কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ তিনি করেননি।

বাবুল মিয়া আরো বলেন, আমাদেরকে স্বপ্নার স্বামী সুমিন প্রথমে কল দিয়ে বলেছে স্বপ্নার শরীর খারাপ, তাকে নিয়ে সিলেটে হাসপাতালে যাচ্ছে। এর ঘন্টা খানেক পর সুমিন আবার কল দিয়ে বলে স্বপ্না মারা গেছে। যেখানে সুমিন আমাদেরকে জানিয়েছে স্বপ্না মারা গেছে, সেখানে আমি কিভাবে বিশ্বনাথের পুলিশকে খবর দেবো?

তিনি এও বলেন, আমি আমার বোনের লাশ দেখেই বলেছি হত্যা মামলা করবো। অথচ আমাকে বাদি করে অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে। আমরা বোন আত্মহত্যা করেছে এটা তার স্বামীর দাবি। কিন্তু আমাদের দাবি স্বপ্নাকে হত্যা করা হয়েছে। তাহলে আমি কেনো আমার বোনের অপমৃত্যুর মামলা করবো? এই হত্যা গোপন করতে আমাকে বাদি করে অপমৃত্যুর মামলা দিয়েছে তার স্বামী সুমিন। 

তবে এ ব্যপারে স্বপ্নার স্বামী সুমিন বলছেন, গত শনিবার (২ মে) রাতেই গ্রামের স্থানীয় ইউপি মেম্বারের মাধ্যমে তিনি পুলিশকে স্বপ্নার আত্মহত্যার খবর দিয়েছেন। তার এই খবরের প্রেক্ষিতে সকালে পুলিশ এসে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং স্বপ্নার লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য নিয়ে যায়।

ঘটনাসূত্রে জানা যায়, এ ঘটনা পরিদর্শন করতে শনিবার (২ মে) সকালে সুমিনের বাড়িতে গিয়েছিলেন বিশ্বনাথ থানার এসআই মো. গাজী মুয়াজ্জেম। 

এ অভিযোগের ব্যাপারে কথা হয় এসআই মো. গাজী মোয়াজ্জেম ও বিশ্বনাথ থানার ওসি শামীম মূসা দুজনের সাথে। তারা দুজনেই বলেন, স্বপ্নার ভাইয়ের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং স্বপ্নার ভাই পুলিশকে এ তথ্য দিয়েছেন। 


অপমৃত্যুর মামলায় স্বাক্ষর প্রসঙ্গে বাবুল মিয়া বলেন, আমরা যখন সকালে সুমিনের বাড়িতে যাই স্বপ্নার লাশ দেখতে, তখন গিয়ে দেখি এসআই গাজী মুয়াজ্জেমসহ বিশ্বনাথ থানার একদল পুলিশ কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত হয়ে কথাবর্তা বলছে। আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা যখন স্বপ্নার লাশ দেখতে চাই তখন এসআই গাজী মুয়াজ্জেম বলেন লাশ দেখতে হলে আগে স্বাক্ষর করতে হবে। স্বাক্ষর না করলে লাশ দেখা যাবে না। তখন তিনি বেশ কয়েকটি সাদা কাগজে আমার কয়েকটি স্বাক্ষর নেন। আমিও কোনো কিছু না বুঝে বোনের মুখ দেখার জন্য স্বাক্ষর দিয়ে যাই। পরবর্তিতে আমি জানতে পারি এই স্বাক্ষর ব্যবহার করে আমাকে বাদি করে আমার বোনের অপমৃত্যুর মামলা দেওয়া হয়েছে। কিন্ত আমার স্বাক্ষরকৃত যে অপমৃত্যুর মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে সেখানে যে হাতের লিখা আছে সেই লিখার সাথে আমার লিখার কোনো ধরনের মিল খুঁজে পাইনি।

বাবুল মিয়া আরো বলেন, আমার বোন মারা যাওয়ার কিছুদিন পর আমি বিশ্বনাথ থানায় যাই। আমি গিয়ে বলি মামলার কি অবস্থা? তখন থানা থেকে আমাকে একটি কাগজ দিয়ে বলা হল মামলা হয়েছে। এটা নিয়ে বাসায় চলে যান। আমি তেমন লেখাপড়া জানি না। তাই মনে করিছে হত্যা মামলা হয়েছে। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে যখন আমার পঞ্চায়েতের মুরব্বিদের এই কাগজ দেখাই তখন তার বলেন, তুই তো তর বোনের অপমৃত্যুর মামলা করেছিস এটা হত্যা মামলা হয়নি।

বাবুল বলেন, পরিকল্পিত হত্যাকান্ডকে অপমৃত্যুর মামলা দিয়ে হত্যাকান্ডকে ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগে আমি গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) পুলিশ সুপার বরাবর একটি আবেদন করেছি। আমি মনে করি বিশ্বনাথ থানার যে তদন্ত কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম স্বপ্নার স্বামী সুমিন কর্তৃক প্রভাবিত হয়েছেন। তাই একটি হত্যা মামলাকে পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা দিয়েছে।

বাবুল মিয়া যে এই অপমৃত্যু মামলার বিবরণ সম্পর্কে অবহিত নন, এ বিষয়টি অনুসন্ধানেও সত্যতাও পাওয়া গেছে। অপমৃত্যুর মামলার বিবরণের শেষ লাইন ছিল ‘বর্তমানে আমার বোন স্বপ্না বেগমের মৃতদেহ তার স্বামী সুমিন আহমদ এর বাড়িতে আছে’। এখানে ‘বাড়িতে’ লিখার পরই বাবুলের স্বাক্ষর দেওয়া। তাই ‘আছে’ শব্দটি লিখতে হয়েছে পরের লাইনে। এতে স্পষ্ট হয় অপমৃত্যু মামলার বিবরণ লেখার আগেই বাবুল মিয়ার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। 

তবে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন এসআই গাজী মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, আমি বাবুলের কাছ থেকে কোনো স্বাক্ষর নেইনি। বাবুলের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছি।

স্বপ্নার পরিবার সূত্র জানায়, চলতি বছর ৬ ফেব্রুয়ারি স্বপ্নার সাথে সুমিনের পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়। সুমিন লিডিং ইউনিভার্সিটিতে চর্তুথ শ্রেনীর কর্মচারী হিসেবে কর্মরত আছেন। বিয়েতে কোনো যোৗতুক দাবি করেননি সুমিন। তারপরও স্বপ্নার পরিবার ধারদেনা করে ফার্নিচার ও গৃহস্থালির জিনিসপত্র দিয়েছেন। কিন্তু বিয়ের পর পর স্বপ্নাকে আরও যৌতুকের জন্য নির্যাতন করতেন সুমিন। এ ব্যাপারে প্রায়ই মা এবং ভাবিকে ফোন করে বলতেন স্বপ্না। এই ফোন করা নিয়েও সুমিন স্বপ্নাকে সন্দেহ করতেন। এসব নিয়েও তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।

স্বপ্নার পরিবার সূত্র জানায়, চলতি বছর ৬ ফেব্রুয়ারি স্বপ্নার সাথে সুমিনের পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়। সুমিন লিডিং ইউনিভার্সিটিতে চর্তুথ শ্রেনীর কর্মচারী হিসেবে কর্মরত আছেন। বিয়েতে কোনো যোৗতুক দাবি করেননি সুমিন। তারপরও স্বপ্নার পরিবার ধারদেনা করে ফার্নিচার ও গৃহস্থালির জিনিসপত্র দিয়েছেন। কিন্তু বিয়ের পর পর স্বপ্নাকে আরও যৌতুকের জন্য নির্যাতন করতেন সুমিন। এ ব্যাপারে প্রায়ই মা এবং ভাবিকে ফোন করে বলতেন স্বপ্না। এই ফোন করা নিয়েও সুমিন স্বপ্নাকে সন্দেহ করতেন। এসব নিয়েও তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। স্বপ্নার মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরো বলেন, আমরা গরিব তাই মেয়েরে হত্যা করার পরও কিচ্ছু করতে পারছি না।

তবে স্বপ্নার স্বামী সুমিন আহমেদের দাবি স্বপ্নার পরিবার মিথ্যা অভিযোগ করছেন। তিনি বলেন, স্বপ্নাকে আমি কোনো দিন মারধর করিনি। এমনকি গালিও দেইনি। কিন্ত স্বপ্না প্রায়ই মোবাইলে কার সাথে কথা বলতো। পরে নাম্বার ডিলিট করে দিত। সে মারা যাওয়ার আগে সুফিয়া নামের একটা নাম্বারে কল দিয়ে কথা বলে। তখন আমি এই নাম্বার নিয়ে ঘরের বাইরে গিয়ে কল দিয়ে দেখি একজন পুরুষের কন্ঠ। পরে আমি এ ব্যাপারে স্বপ্নাকে জিজ্ঞেস করি। সে বলে আমাকে এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাস করবে না। তখন আমাদের মধ্যে কিছু কথা কথা কাটাকাটি হয়।

সুমিন বলেন, এ ব্যাপারে আমি তার ভাবিকে কল দিয়ে জানাই। এরপর স্বপ্না বাথরুমে গিয়ে হারপিক খেতে চায়। তখন আমি জোর করে তার কাছ থেকে হারপিক নিয়ে যাই। এরপর স্বপ্না আমাদের রান্না ঘরে গিয়ে গলায় ফাঁসি দেয়। আমি দৌড়ে গিয়ে তাকে নিচে নামিয়ে মেডিকেলে নিয়ে আসি। কিন্তু ডাক্তাররা সেখানে রাখেনি। তাই আবার বাড়িতে নিয়ে আমি তার পরিবার ও পুলিশকে খবর দেই।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিশ্বনাথ থানার এসআই মো. গাজী মোয়াজ্জেম বলেন, স্বপ্নার ভাইয়ের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছি। লাশের সুরতহালে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। কোথাও কোনো দাগ ছিল না। প্রাথমিক ভাবে আত্মহত্যাই মনে হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের রির্পোট না আসা পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না।

স্বপ্নার ভাইয়ের পুলিশ সুপার বরাবর আবেদনের অনুলিপি পেয়েছেন উল্লেখ করে ওসি বলেন, লাশের ময়না তদন্ত না করার জন্য স্বপ্নার ভাই আমাকে অনেকবার কল করেছে। আমি বলেছি এটা হবে না ময়না তদন্ত করতে হবে। এখন তিনিই আবার অভিযোগ করছেন। হতে পারে তার নামে অন্য কেউ কল করেছে। তবে ময়না তদন্ত না করার জন্য কল দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন স্বপ্নার ভাই বাবুল মিয়া।

Post a Comment

0 Comments