সিলেট জুড়ে ছড়িয়েছে ধর্ষণের মহামারি, ধর্ষিতের সংখ্যা ৩৪০

ছবি : প্রতীকী। 

সিলেটে প্রেম কিংবা বিয়ের প্রলোভনে বেড়েছে ধর্ষণ। বেশীর ভাগ এসব ঘটনার শিকার হচ্ছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণীরা। আর পরকিয়ার প্রেমে পড়ে বিয়ের আশ্বাসে ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন কতিপয় গৃহবধূ। প্রেম কিংবা বিয়ে এই দুটি বিষয় পুরোটা বিশ্বাসের উপর নির্ভর। সেই বিশ্বাসের জায়গাতে ভুল হওয়াতেই সিলেট বিভাগ জুড়ে বেড়েছে ধর্ষণ। এসব ঘটনায় থানায় মামলা হলেও তেমন কোন প্রতীকার পাচ্ছেন না ভুক্তভোগিরা। আর বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় অনেকেই আত্মসম্মানের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আইনী পদক্ষেপও নেন না। 

গত বছরের তুলানায় এ বছর সিলেট বিভাগে বেড়েছে ধর্ষণের ঘটনা। তবে সম্প্রতি মৌলভীবাজারে বাসায় গাঁজা পার্টির আয়োজন করে তরুণীকে ধর্ষণ, সিলেটে দুই কিশোরী ধর্ষণ ও সর্বশেষ মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম থেকে হবিগঞ্জ আসার পথে আন্তঃনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনে এক তরুণীকে (৩০) ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত যুবক সাঈদ আরিফকে (২৯) আটক করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ৫ বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে পুলিশ জানায়।

সচেতনার পাশাপাশি ধর্ষণের ঘটনা সামাজিকভাবে প্রতিহত করা না গেলে দিনে দিনে এসব ঘটনা বৃদ্ধি পাবে। সেই সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর হওয়ার জন্য পরামর্শ সচেতন মহলের। সিলেট মহানগরী জালালাবাদ থানাধীন এলাকা থেকে দুই কিশোরীকে অহপরণ করে ধর্ষণ করা হয়।  সেই সাথে ভিডিও ও ছবি তুলা হয়। একটি থানা এলাকায় এমন অহপরণ ঘটনা ঘটলেও পুলিশ সাথে সাথে তৎপর হলেও হয়তো এমন ঘটনা ঘটতে না। সিলেট বিভাগে গত ৮মাসে ৩৪০জন ধর্ষণের শিকার হয়ে ওসিসিতে চিকিৎসা নেন। সেই সাথে যৌন হয়রানি কিংবা নানাভাবে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেন ৪১৩ জন কিশোরী-তরুণী ও গৃহবধূ।

ওসিসি সূত্র জানায়, জানুয়ারি মাসে সিলেট ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি)’তে আক্রান্ত ভিকটিমের সংখ্যা ছিল ৬১জন। এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কিশোরী-তরুণী-গৃহবধূসহ ৫০জন। ফেব্রুয়ারি মাসে ওসিসিতে চিকিৎসা নেন ৬৮জন ভিকটিম, এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৫০জন। মার্চ মাসে ওসিসিতে চিকিৎসা নেন ৬৭জন ভিকটিম, এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৫২জন। এপ্রিল মাসে ওসিসিতে চিকিৎসা নেন ২৪জন, এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হন ২৩জন। মে মাসে ওসিসিতে চিকিৎসা নেন ২৮জন ভিকটিম, এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হন ২৬জন। 

জুন মাসে ওসিসিতে চিকিৎসা নেন ৪৫জন ভিকটিম, এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হন ৩৭জন। জুলাই মাসে ওসিসিতে চিকিৎসা নেন ৪৫জন ভিকটিম, এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হন ৪৩ জন। আগস্ট মাসে ওসিসিতে চিকিৎসা নেন ৫৮জন ভিকটিম, এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হন ৪৮জন। সেপ্টেম্বর মাসে (৭ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত ওসিসিতে চিকিৎসা নেন ১৭জন ভিকটিম, এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হন ১১জন।

পুলিশ সূত্র জানায়, বিয়ের প্রলোভন দিয়ে ৬ মাস ধরে এক বিধবাকে ধর্ষণের অভিযোগে আবদুল্লাহ মিয়া (৩৫) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে  গোয়ানইঘাট থানা পুলিশ। তিনি উপজেলার পশ্চিম আলীরগাঁও ইউনিয়নের পুকাশ প্রামের মো. আবদুর রবের ছেলে। গত শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) তাকে গ্রেফতার করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় সালিশ বৈঠক বসে। সালিশে উভয় শারীরিক সম্পর্কের কথা স্বীকার করলে ওই নারীকে বিয়ে করতে বলা হয় আবদুল্লাহ মিয়াকে। কিন্তু তাতে রাজি হননি আবদুল্লাহ। এরপর ওই নারী থানায় মামলা দায়ের করেন।

অপরদিকে, মৌলভীবাজারে বাসায় গাঁজা পার্টির আয়োজন করে তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে মৌলভীবাজার মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের হয়। ভুক্তভোগী ওই তরুণী বাদী হয়ে গত সোমবার (৩১ আগস্ট) থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। পরে মডেল থানা পুলিশ তা মামলা হিসেবে আমলে নেয়। মামলায় এজাহারে ছাত্রফ্রন্ট মৌলভীবাজার জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক (বহিষ্কৃত) সজীব তুষারকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এছাড়া জেলা বাসদের সদস্য রায়হান আনসারী ও নারী সুরক্ষা আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মারজিয়া প্রভাকে ধর্ষণের সহযোগী উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে। 

গত ৩ আগস্ট রাতে মৌলভীবাজার শহরের সোনাপুর এলাকার মাহমুদ এইচ খান নামে এক তরুণের বাসায় ধর্ষণের ওই ঘটনা ঘটে। ওই দিন ওই বাসায় গাঁজা পার্টি দেওয়া হয়। এই পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন পাঁচ জন তরুণ-তরুণী। সেখানে সজীব তুষার এক তরুণীকে ধর্ষণ করেন। বিষয়টি চাপা থাকলেও প্রায় ২০ দিন পর এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাহমুদ এইচ খান পোস্ট দিলে বিষয়টি প্রকাশ পায়। মাহমুদ এইচ খানের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে জানা যায়, মাহমুদ এইচ খানের মৌলভীবাজারের বাসায় গত ৩ আগস্ট ডিনার পার্টির আয়োজন করা হয়। পার্টিতে উপস্থিত হন ছাত্রফ্রন্ট মৌলভীবাজার জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক (বহিষ্কৃত) সজীব তুষার, বাসদ কর্মী (বাসদ মৌলভীবাজার জেলা বর্ধিত ফোরামের বহিষ্কৃত সদস্য) আয়কর আইনজীবী রায়হান আনসারী, নারী সুরক্ষা আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মার্জিয়া প্রভা এবং ধর্ষণের শিকার ওই তরুণী। 

মামলার বাদী ধর্ষণের শিকার ওই তরুণী গণমাধ্যমে বলেছিলেন, ‘আমি প্রথমে পরিবারের মান-সম্মান ও সামাজিক অবস্থান চিন্তা করে মামলা করিনি। আমার পরিবারকে জানানোর পর তারাও মামলায় সম্মতি দেয়নি। পরে যখন দেখলাম আমাকে উল্টো দোষ দেওয়া হচ্ছে এবং একটি ধর্ষণের ঘটনাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে, তখন আমার কাছে বেশি আঘাত লাগে। তখন পরিবারের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে আমি মামলা করি। সত্য জানানোর জন্য মামলা দেওয়া তখন জরুরি ছিল। আশা করছি, সঠিক বিচার পাবো এবং আসল সত্য বের হয়ে আসবে।’

এছাড়া, সিলেটে এক কিশোরীকে (১৪) অপহরণ করে এক নারীর বাসায় ১৭ দিন আটকে রেখে ধর্ষণের ঘটনায় ওই নারীসহ ধর্ষককে গ্রেফতার করে পুলিশ। অভিযুক্ত ধর্ষকের নাম সাদিকুর রহমান (২২)। 

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে গ্রেফতারকৃতদের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। এর আগে বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকাল জালালাবাদ থানা পুলিশের একটি দল শহরতলীর মইয়াচর থেকে সাদিকুর রহমান ও সহায়তাকারী নারীকে গ্রেপ্তার করে। আর উদ্ধারকৃত কিশোরীকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি করা হয়। ওই কিশোরী পুলিশকে জানায়, সাদিকুর রহমান তাকে অপহরণ করে একটি বাসায় আটকে রেখে ১৬ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ধর্ষণ করে।

অপরদিকে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার লালাবাজারে এক কিশোরীকে (১৬) ধর্ষণ এবং ভিডিও ও ছবি ধারণের দায়ে কান্দিগাঁও ইউপির ৪ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য শাবাজ আহমদকে (৩৮) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। 

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় জালালাবাদ থানা পুলিশ গোপাল এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় কিশোরীর মা বাদী হয়ে জালালাবাদ থানায় পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করেন। 

অভিযোগ পাওয়া গেছে ইউপি সদস্য শাবাজ আহমদ ও তার আরও দুই সহযোগী গত ২ সেপ্টেম্বর বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে জালালাবাদ থানাধীন টুকেরবাজারস্থ পীরপুর জামে মসজিদের সামনে থেকে ওই কিশোরীকে অপহরণ করে দক্ষিণ সুরমা থানাধীন লালাবাজারস্থ এক বাসায় নিয়ে যায়। ওইদিন রাত ৯টার দিকে শাবাজ আহমদ ভিকটিমকে ধর্ষণ করার পর তার সঙ্গে থাকা অজ্ঞাতনামা আসামি ভিকটিমকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। এসময় শাবাজ মোবাইলফোনে সেই ভিডিও ও ছবি ধারণ করে।

সংবাদ সূত্র: সিলেট ভিউ ২৪ ডটকম

Post a Comment

0 Comments